বাংলাদেশ , মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০

জাপায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হতাশ নেতাকর্মীরা : চলছে দেবর-ভাবির লড়াই

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১৫ ১৭:৪০:৪৮ || আপডেট: ২০১৯-০৯-১৫ ১৭:৪০:৪৮

অনলাইন রিপোর্ট : দলের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিতে দৃশ্যমান সমঝোতা হলেও রওশন ও জিএম কাদেরের মধ্যে টানাপোড়েন চলছেই। অব্যাহত আছে দেবর ভাবির ঠান্ডা লড়াই। সিনিয়র নেতা ও এমপিদের কাছে টানার প্রতিযোগিতায় দলের এ দুই শীর্ষ নেতা। তবে দলের ২৫ জনের মধ্যে বেশিরভাগ সংসদ সদস্য বর্তমান চেয়ারম্যানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিরোধী দল হিসেবে সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকা ও বারবার অভ্যন্তরীণ বিরোধের ঘটনায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
সূত্র বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে এরশাদের স্ত্রী রওশনকে বিরোধী দলের নেতার পদ দেয়া হলেও যে কোন সময় তিনি চেয়ারম্যানের পদ নিতে ফের বেঁকে বসতে পারেন। এজন্য তাকে দলের একাধিক শীর্ষ নেতা অব্যাহতভাবে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। জিএম কাদেরের পক্ষের অনুসারীরা বলছেন, প্রয়াত এরশাদের দেয়া গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতায় দলের চেয়ারম্যানকেই বিরোধী দলের নেতা হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী তিনিই হবেন বিরোধী দলের প্রধান। কিন্তু এখন এক দলে একাধিক নেতা। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোতে এরকম রেওয়াজ নেই।
জাপা নেতাকর্মীরা বলছেন, এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই দলকে নিজের হাতে নেয়ার চেষ্টা করছেন রওশন। চেয়ারম্যানের পদ নিয়ে তিনি যদি ফের অশান্তির চেষ্টা করেন, তাহলে আবারও দল ভাঙ্গার সমূহ সম্ভাবনা। এতে মূলত জাপার অবস্থান আরও নিচের দিকে নামবে। রাজনীতিতে কোন কদর থাকবে না দলটির। নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে দল পরিবর্তন করতে পারেন। যা দলকে নষ্ট করার শেষ পেরেক দেয়ার শামিল। নেতৃত্বের কোন্দলে ইতোমধ্যে পাঁচভাগে বিভক্ত জাপা। এরশাদের ধারা ছাড়া বাকি সবকটিই নামসর্বস্ব রাজনীতি বৃত্তে বন্দী। গত তিন সেপ্টেম্বর জিএম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা বানানোর জন্য স্পীকার বরারব চিঠি দেয়াকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন রওশনপন্থীরা। এরপর পাঁচ সেপ্টেম্বর গুলশানের বাসভবনে জরুরী সংবাদ সম্মেলন ডাকেন রওশন। জিএম কাদেরের দেয়া চিঠি গঠনতন্ত্রসম্মত নয় বলে স্পীকার বরাবর পাল্টা চিঠি দেন তিনি। নতুন করে দলের নেতৃত্বও ঘোষণা করেন। পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটে। তবে দলের ১৫জন এমপি জিএম কাদেরের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় কিছুটা বেকায়দায় পড়তে হয় কৌশলী রওশনকে।
জানা গেছে, জিএম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা বানানোর চিঠির খবর রওশনের কাছে পৌঁছলে তিনি দলীয় এমপিদের সন্ধ্যায় নিজ বাসায় আসতে বললেও মাত্র চারজন হাজির হন। এতে ক্ষুব্ধ হন তিনি। এদিকে রওশনপন্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়াতে উজ্জীবিত জিএম কাদেরপন্থীরা। এখন রওশনের সঙ্গে দলের প্রভাবশালীদের মধ্যে আছেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মজিবুল হক চুন্নু ও ফখরুল ইমাম। জিএম কাদেরপন্থীরা বলছেন, দলের তৃণমূলসহ কেন্দ্রের বেশিরভাগ নেতা বর্তমান চেয়ারম্যানের পক্ষে অবস্থান নিলেও রওশনের চাওয়া পাওয়াকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ভাঙ্গন ঠেকাতেই সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এরশাদের ছোট ভাই কাদের। এদিকে নতুন করে জাপায় নেতৃত্ব নিয়ে পারিবারিক বিভেদে অস্থিরতায় ভুগছেন পার্টির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই দলে দেবর-ভাবির দ্বন্দ্ব অনেকটাই স্পষ্ট। এরমধ্যে একাধিকবার রওশন ও জিএম কাদের রওশনের গুলশানের বাসভবনে একান্তে কথা বলেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা না যেতেই নতুন কোন ইস্যুতে আবার বিরোধ সৃষ্টি হয়। জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হলে এর বিরোধিতা করেন রওশন।
দলের মধ্যে অস্থিরতার কারণে দলের বনানী ও কাকরাইল কার্যালয়ে প্রতিদিন ভিড় করছেন বিভিন্ন জেলা উপজেলাসহ ঢাকা মহানগর জাপার নেতারা। পার্টির সর্বশেষ খবর নেয়ার চেষ্টা করছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের থেকে। এদিকে বিরোধী দল হিসেবে জাপার জনস্বার্থে কোন কর্মসূচী নেই। সাংগঠনিক কার্যক্রম একেবারেই নামসর্বস্ব। অন্যদিকে কোন্দল চলমান। সব মিলিয়ে নেতাকর্মীরা আছেন দ্বিধা দ্বন্দ্বে। তাছাড়া চলমান সমঝোতাতেও তারা একবারেই আস্থা পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, রওশন ও জিএম কাদের মিলে সারাদেশে সাংগঠনিক সফরসহ দলীয় কর্মসূচী যোগ দিলে দল যেমন চাঙ্গা হবে। তেমনি আস্থা ফিরবে সবার মধ্যে।
এ বিষয়ে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন, সকল নেতাকর্মীই চান দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতা হোন জিএম কাদের। তার সঙ্গে পার্টির তৃণমূলের যে সম্পর্ক রয়েছে তাতে তিনি বিরোধী দলের নেতা হলে দল উপকৃত হবে।
পার্টির অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য এটিইউ তাজ রহমান বলেন, পার্টিতে পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা বিভেদ কাম্য নয়। যত দ্রুত সম্ভব তা মিটিয়ে ফেলা উচিত। এতে পার্টি, পার্টির নেতাকর্মী ও দেশ উপকৃত হবে।
সার্বিক বিষয়ে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা মনোনয়ন প্রশ্নে জোর করে কিছু করা হয়নি। জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চিঠি দেয়া হয়েছিল। পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক না করায় বিতর্ক উঠেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরশাদ সাহেব যখন বেঁচে ছিলেন তিনিও কিন্তু এভাবে বিরোধী দলীয় নেতা হয়েছিলেন, আমাকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করেছিলেন। পরে আমাকে সরিয়ে রওশন এরশাদকে উপনেতা করা হয়, তখনও কিন্তু পার্লামেন্টারি পার্টির কোন মিটিং করা হয়নি।

ট্যাগ :